Tuesday, March 26, 2013

ব্যাং রাজকুমার



 

এইচ এম শরীফ উল্লাহ
*******************


এক.
কোন এক সুন্দর সন্ধ্যায় একজন তরুণ রাজকুমারী তার শিরাবরণ এবং সুন্দর জুতো পড়ে একটি ছায়া ঢাকা অরণ্যের মধ্য দিয়ে ভ্রমনে বের হলো; যখন সে একটি ঠান্ডা জলের ঝর্ণার নিকট আসলো, তখন ঐ ঝর্ণার মাঝা মাঝি একটা ফুল দেখতে পেলো। একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য সে নিচে বসলো।
এখন তার হাতে একটি স্বর্ণের সুন্দর বল আছে যা সে বার বার উপরের দিকে ছুড়ে মাড়ছে আর তা লুফে নিচ্ছে। এটা ছিলো তার প্রিয় খেলা। এবং সে এখন বলটি বার বার উপরের দিকে ছুড়ে মারছে আর তা লুফে নিচ্ছে। একটা সময় পরে সে বলটাকে এতো উপরের দিকে ছুরে মারলো যে বলটি যখন নিচের দিকে ফিরে এলো তা আর সে ধরতে পারলো না। বলটি নিচে পড়ে গড়িয়ে দূরে চলে গেলো; অবশেষে বলটি ঝর্ণার মধ্যে গিয়ে পড়লো। রাজ কুমারীটি তার বলটি খোঁজতে লাগলো, কিন্তু এটি ছিলো এতোটাই গভীর যে, সে আর এর তলদেশ দেখতে পেলো না। সে এখন কাঁদতে লাগলো, আর বলতে লাগলো-
‘হায়! যদি কেউ আমার বলটি এনে দিতে পারে, তাকে আমার সুন্দর সুন্দর জামা কাপড় আর মুক্তা ও স্বর্ণের গহনাগুলো সব দিয়ে দিবো।যখন সে এভাবে কথা বলতে লাগলো তখন একটি ব্যাঙ পানি থেকে মাথা বের করে তাকে বললো-
‘হে রাজকুমারী, তুমি এভাবে দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে কাঁদছ কেন?’
‘হায়!’ রাজ কুমারী ব্যাঙকে বললো ‘তুমি তো একটি কদর্য ব্যাঙ, তুমি আমার জন্য কী-ই বা করতে পারবে,? আমার স্বর্ণের বলটি ঝর্ণার জলে পড়ে গিয়ে নীচে তলিয়ে গেছে।'
ব্যাঙ বললোঃ ‘আমি তোমার মুক্তা, স্বর্ণ আর মূল্যবান কাপড় চাই না; কিন্তু তুমি যদি আমাকে ভালোবেসে তোমার সাথে থাকতে দাও, তোমার স্বর্ণের প্লেইটে খেতে দাও, এবং তোমার সাথে তোমার নিছানয় শুতে দাও তবে আমি তোমার স্বর্ণের বলটি এনে দিতে পারি।’

‘কী আজে বাজে কথা!’,রাজকুমারী মনে মনে ভাবছে, ‘এই বোকা ব্যাঙটি কথা বলছে!,’সে এমন কী ঝর্ণা থেকে উঠে এসে আমাকে দেখতেও তো পারবে না, যদিও এটা আমার বলটি এনে দিতে পারে। অতএব আমি এটাকে বলতে পারি, ‘তুমি কী চাও আমার কাছে?’
এ কথা ভেবে সে ব্যাংটিকে বললো, ‘ঠিক আছে, যদি আমার বলটি এনে দিতে পারো, তুমি যা চাও আমার কাছে, আমি তাই দিবো।’
তার পর ব্যাঙটি ডোব দিয়ে দু’পায়ে সাঁতার কেটে পানির গভীরে চলে গেলো,খানিকক্ষণ পর মাথায় করে বলটি নিয়ে ভেসে উঠলো; এবং বলটি জলের কিনারে ছুড়ে মারলো।

দুই.
যখনই তরুণ রাজকুমারীটি বলটি দেখতে পেলো,সে দৌড় দিলো বলটি নিয়ে আসার জন্য; এবং বলটি আবার হাতে পেয়ে সে এতোই আনন্দিত হলো যে, ব্যাঙগের কথা কিছুই না ভেবে যত তারা তারি সম্ভব বলটি নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটে চলে গেলো।

ব্যাঙটি তার পিছন দিক থেকে তাকে ডাকতে লাগলো,
‘একটু দাঁড়াও রাজকুমারী, আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও যেভাবে আমাকে কথা দিয়ে ছিলে।’

কিন্তু সে ব্যাঙগের একটি কথা শোনার জন্যও থামলো না।পরের দিন, যখন রাজকুমারী দুপুরের খাবার খেতে বসলো, সে একটি অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেলো- যেন কোন কিছু মার্বেলের সিঁড়ির কাছে এগিয়ে আসছে তার পর যেন দরজায় কেউ মৃদু টোকা মারছে,আর একটি ছোট্ট আওয়াজে কাঁদছে আর বলছেঃ
‘আমার প্রিয় রাজকুমারী, দরজাটি খোল,
দরজাটি খোল এখানে প্রকৃত ভালোবাসার জন্য!
এবং স্মরণ করো সবুজ অরণ্যের ছায়ায় ঠান্ডা ঝার্ণায় তুমি এবং আমার মাঝে যে কথা হয়েছিলো।’

তার পর রাজকুমারী দরজাটির নিকট গিয়ে তা খোলে সেখানে সে ব্যাঙটিকে দেখতে পেলো। যার কথা সে সম্পুর্ণ ভুলে গুয়েছিলো, এটা দেখে সে দুঃখের সাথে ভীত হয়ে পড়লো, এবং যত তারা তারি সম্ভব দরজাটি বন্ধ করে আবার তার বসার আসনে ফিরে এলো।

রাজা, তার বাবা তাকে কোন কিছু ভীতো করে তোলেছে এটা বুঝতে পেরে, জিজ্ঞেস করলো তাকে, ‘ঘটনা কী হয়েছিলো?’
সে বললো, ‘এখানে একটি কদর্য ব্যাঙ দরজার পাশে, যেটা আজ সকালে আমার বলটা ঝর্ণার জল থেকে উঠিয়ে দিয়ে ছিলো। আমি এটার সাথে এই ওয়াদা করেছিলাম যে যদি সে আমার বলটই ঝর্নার তলদেশ থেকে উঠিয়ে এনে দিতে পারে তবে তার আবদার অনুযায়ি সে আমার সাথে থাকবে, এই কথা মনে করে যে, এটা কখনো ঝর্ণার জল থেকে উঠে আসতে পারবে না, কিন্তু এটা দরজার পাশে এবং ভিতরে আসতে চায়।’
যখন সে কথা বলছিলো, ব্যাঙটি তখনো দরজায় নক করছিলো, এবং বলছিলোঃ

‘দরজাটি খোল, আমার প্রিয় রাজকুমারী,
দরজাটি খোল, এখানে তোমাকে প্রকৃত ভালোবাসার জন্য!
এবং স্মরণ করো সবুজ অরণ্যের ছায়ায় ঠান্ডা ঝার্ণায় তুমি এবং আমার মাঝে যে কথা হয়েছিলো।”

তিন.
রাজা মহাশয় বললেন,’তুমি যেভাবে এটাকে কথা দিয়েছিলে, তা তোমাকে অবশ্যই রক্ষা করতে হবে; সুতরাং যাও দরজাটি খোল, তাকে প্রাসাদে আসতে দাও।’

রাজার কথায় সে ব্যাঙটাকে প্রাসাদে আসতে দিলো, আর ব্যাঙটা প্রাসাদে এসে রোমের মাঝখানে লাফাতে লাগলো তার পর এটা সোজা হয়ে রাজকুমারীর আসনের কাছে এসে টেবিলের পাশে দাঁড়ালো।
‘সে রাজকুমারীর নিকট প্রার্থনা করে বললো,’দয়া করে আমাকে চেয়ারের উপর উঠিয়ে তোমার পাশে বসতে দাও না।’
তৎক্ষণাৎ রাজকুমারী তাকে পাশে উঠিয়ে বসালো, ব্যাঙটি বললো, ‘তোমার খাবার প্লেইটটি আমার অধিকতর কাছে রাখো যাতে আমি এটা থেকে খাবার উঠিয়ে খেতে পারি।’

রাজকুমারী এটা করলো, এবং যখন ব্যাঙটি যতটুকু সম্ভব খেতে পারে, ততটুকু খেয়ে বলে, ‘আমি এখন ক্লান্ত; আমাকে উপরের তলায় নিয়ে চলো, এবং তোমার বিছানায় শায়িত করো।’ এবং রাজকুমারী যদিও অনিচ্ছাকৃত ভাবে তাকে তার হাতে উঠালো, তার পর তার বিছানায় নিজ বালিশে শায়িত করে দিলো, যেখানে সে সারা রাত নীরবে ঘুমিয়েছিলো।

ঘরের লাইট জ্বলে উঠা মাত্র ব্যাঙটি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলো, লাফা লাফি করে নিচের তলায় গিয়ে প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেলো।
রাজকুমারী চিন্তা করলো, ‘এখন, অবশেষে সে চলে গেলো, এবং তার সাথে আমার আর কোন সমস্যা হবে না।’কিন্ত রাজকুমারীর ধারণা ছিলো ভুল; যখন রাতের বেলা সে আবার ফিরে এলো, সে আবার আগের মতোই দরজায় আগমের মৃদু পায়ের শব্দ শুনতে পেলো; এবং ব্যাঙটি একাধিকবার এলো আর বললো,
‘আমার প্রিয় রাজকুমারী, দরজাটি খোল,
দরজাটি খোল এখানে প্রকৃত ভালোবাসার জন্য!
এবং স্মরণ করো সবুজ অরণ্যের ছায়ায় ঠান্ডা ঝার্ণায় যে কথা হয়েছিলো তুমি এবং আমার মাঝে ।’

যখন রজকুমারী দরজা খুলে দিলো, ব্যাংটি প্রাসাদে এলো, আগের মতোই তার বালিশে নিদ্রা গেলো ভোরের আগমন হওয়া পর্যন্ত। এভাবে তৃতীয় রাতেও একই ঘটনা ঘটলো। কিন্ত রাজকুমারী যখন পরবর্তী সকালে নিদ্রা থেকে জাগ্রত হোল, সে ছিলো অবাক- ব্যাঙের পরিবর্তে সুন্দর হ্যান্ডসাম একজন রাজপুত্র দেখে, মনোমুগ্ধকর চোখে স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে আছে, এমন মনোরম সে আর কখনো দেখে নি। সে তার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

চার.
সে তাকে বললো যে এক হিংসুক জাদুকরী তাকে মানুষ থেকে ব্যাঙ বানিয়ে রেখেছে; এবং এ অবস্থায় সে ছিলো অপেক্ষমান যে পর্যন্ত না
কোন এক জন রাজকুমারীর সঙ্গে দেখা হয়, এবং সেই রাজকুমারী ঐ ঝর্ণা থেকে মুক্ত করে তাকে তার নিজ প্লেইটে খেতে দিবে এবং তিন রাত্রি তাকে তার বালিশে ঘুমাতে দিবে।
রাজকুমার বললো, তুমি জাদুকরের নিষ্ঠুর মন্ত্র ভেঙ্গে আমাকে মুক্ত করেছ, এখন আমার আর কোন কিছুর প্রতি আকাঙ্ক্ষা নেই, কিন্ত তুমার উচিৎ আমার সঙ্গে আমার বাবার রাজ্যে যাবে, যেখানে আমি তোমাকে বিয়ে করবো, এবং ভালো বাসায় জড়িয়ে রাখবো চিরকাল।তরুণী রাজকুমারী, নিশ্চয়ই তুমি এ ব্যাপারে একমত হবে।

অবশেষে আনন্দে ভরপুর তাজা মনে রাজকুমারীকে সাথে নিয়ে আটটি রাজকীয় ঘোড়ায় সজ্জিত টমটমে চড়ে রাজপুত্র তার বাবার রাজ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলো। সেখানে তারা নিরাপদে পৌঁছে রাজকীয় ভাবে রাজকন্যার সাথে বিয়ে সম্পন্ন করে সুখের স্বর্গে বসবাস করা শুরু করলো। যে সুখের কোণ অন্ত নেই।

——-

একটি অনূদিত গল্প
১৫ টি মন্তব্য
Jolrashiনুসরাত জাহান আজমি০২ জুন ২০১২, ০৯:৫২
রুপকথার গল্প পড়তে দারুন ভাল লাগে।গল্পটাও খুব সুন্দর হয়েছে....
bonofolএইচ এম শরীফ উল্লাহ০২ জুন ২০১২, ১৩:৩৯
ধন্যবাদ নুসরাত জাহান আজমি। ভালো লেগেছে জেনে আমারও ভালো লাগ্লো।
শুভকামনা জানবেন।
Rabbaniরব্বানী চৌধুরী০২ জুন ২০১২, ১০:২৫
খুব ভালো লাগল।
অনেক ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা রইল। ভালো থাকবেন।
bonofolএইচ এম শরীফ উল্লাহ০২ জুন ২০১২, ১৩:৪০
ধন্যবাদ আপনাকে। খুব ভালো থাকুন।
dollarজিনজির০২ জুন ২০১২, ১০:২৯
যে সুখের কোণ অন্ত নেই।

খুব ছোট বেলায় এই ধরনের গল্প একবার শুনেছিলাম। তখন যেমন মজা পেয়েছিলাম, আজ এতদিন পর সেই রকম একটা গল্প পড়ে খুব আনন্দ হল। শুভেচ্ছা জানবেন।
bonofolএইচ এম শরীফ উল্লাহ০২ জুন ২০১২, ১৩:৪১
জিঞ্জির ভাই, শুভেচ্ছা আপনাকেও। খুব ভালো লাগ্লো আপানার ভালো লেগেছে জেনে।
শুভকামনা জানবেন।
kamaluddinকামাল উদ্দিন০২ জুন ২০১২, ১১:৩৭
সামুতে, কমেন্টের মাধ্যমে এখান থেকে পুরো কপি পেষ্ট মাইরা দিয়া আসছি । ওখানে তো পুরোটা আসেনি ।
bonofolএইচ এম শরীফ উল্লাহ০২ জুন ২০১২, ১৩:৪৩
ধন্যবাদ সাদামনের মানুষ কামাল ভাই। এবার এডিটে পুরোটা এসেছে ওখানে। আমার কম্পিউটারে কোন সমস্য
হচ্ছিলো না কী বুঝলাম না। 
শুভকামনা জানবেন।
somoynewsইসময়০২ জুন ২০১২, ১১:৪২
রুপ কথার গল্প । দারুন ! ধন্যবাদ ।
bonofolএইচ এম শরীফ উল্লাহ০২ জুন ২০১২, ১৩:৪৪
ধন্যবাদ ভাই। খুব ভাল থাকুন।
শুভেচ্ছা রইলো।
sujonsarkarঅনিন্দ্য অন্তর অপু০২ জুন ২০১২, ১৩:৩৯
bonofolএইচ এম শরীফ উল্লাহ০৩ জুন ২০১২, ০৭:১৫
কি খবর অপু?
শুভেচ্ছা তোমাকেও।
খুব ভালো থেকো।

No comments:

Post a Comment